জোতিষ বিজ্ঞানে গ্রহের ভূমিকা

মানুষের গুহা জীবন হতে আধুনিক কম্পিউটার যুগ পর্যন্ত (From cave life to modern computer age)বিজ্ঞানের নব নব আবিস্কারের সাথে সাথে মানুষের চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রেও প্রসারিত হয়েছে।অনেক প্রতিকূলতার মাঝেও জীবনের আগমন ও প্রবাহ যেমন থেমে নেই, ঠিক তেমনি সভ্যতার বর্তমান পর্যায়ে জ্ঞানের আপরাপর শাখার মত জ্যোতিষ বিজ্ঞান চর্চা, অনুশীলন এবং গবেষণাও থেমে নেই।সমগ্র বিশ্ব জগতে শ্রেষ্ট চিন্তাশীল বিবেকবান ও প্রজ্ঞাবান জীব হিসেবে মানুষের অবস্থান শীর্ষে।তাই এই অসীম মহা বিশ্বে মানুষের অবসথান, তার স্বাধীন বিচরণশীল মনোবৃত্তি ও পারিপার্শ্বিক পরিসি’তি ইত্যাদির প্রেক্ষিতে সর্বকালে সর্বযুগে একদল নিবেদিত প্রাণ মানুষ নিজস্ব চিন্তা -চেতনা প্রসারিত করেছেন তাঁরাই হলেন জ্যোতিষী (Astrologer)

অতি সুপ্রাচীন কাল হতে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের অধিকাংশ প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি, পন্ডিত, গণিতজ্ঞ, দার্শনিক ও বিজ্ঞানী প্রাথমিক পর্যায়ে মানুষ, দেশ জাতি বা সমপ্রদায়ের উপর অদৃষ্টের প্রভাব আবিস্কার করতে গিয়ে আকাশের গ্রহ-নক্ষত্র গুলোকে নির্বাক বিষ্ফরিত দৃষ্টি ও অনুসন্ধিৎসু মন দিয়ে অবলোকন করতে শুরু করেন।এরই ফলে এক পর্যায়ে তত্ত্ব ও তথ্যের অনন্যতার কারনে রাশিচক্রের (Zodiac) বিভিন্ন স্থানে সৌর মন্ডরের গ্রহ-নক্ষত্রাদির অবস্থানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব যে রয়েছে এ ব্যাপারে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের পন্ডিত জ্ঞানী ও শিক্ষিত সম্প্রায়ের মধ্যে কোন দ্বিমতের অবকাশ নেই।এ কথা আজ পরিস্কার যে, গ্রহ গুলোর প্রভাব শুধু স্থান কালের উপরই বিরাজমান নয়; এর প্রভাব ব্যক্তি মানসের উপরও শুধু ক্রিয়াশীল নয়, মানব শরীরের গ্রন্থী (Gland) গুলোর উপরও এর সুস্পষ্ট প্রভাব বিরাজমান।এটাও সত্যি যে মানুষ জন্ম সময়ে এক একটা নক্ষত্রের অধীন হয়ে জন্মায়।

শুধু তাই নয়।জ্যোতির্বিজ্ঞান (Astronomy) মতে হিসাব করে যেমন গ্রহদের অবস্থান, দূরত্ব-গতিবিধি, চন্দ্রগ্রহণ, সূর্যগ্রহণ প্রভৃতির সঠিক হিসাব নির্ণয় করা যায়, তেমনি জ্যোতিষবিজ্ঞান (Astrology) মতে জীবন প্রবাহের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত জীবনের ঘটনা প্রবাহের ইঙ্গীত, আমাদের জীবনের কোথায় সমস্যা, কোন সময়ে কিসের দ্বারা উন্নতি বা কর্মপথ কি, পরিবেশ, পারিপার্শ্বিক অবস্থা, রাষ্ট্রীয় অবস্থা, ব্যবসা, চাকুরী, রোগ-ভোগ, স্বাস্থ্য, আর্থিক উন্নতি বা অর্থক্ষতি ইত্যাদি বিষয় নির্ণয় করাও সম্ভব।আজ আর কারো আজানা নয় যে, চন্দ্রের (Moon) কারণে সমুদ্রে ও নদীতে জোয়ার-ভাটা হয়।

এখানে উল্লেখ করা যায় যে, জ্যোতিষশাস্ত্র (Astrology) মতে পৃথিবীর পানির উপর চন্দ্রের প্রভাব ক্রিয়াশীল, হাজার বছর আগে থেকে জানা থাকেলেও একথার সত্যতা প্রমাণিত হয় ১৬৮৭ খৃষ্টাব্দে বিজ্ঞানী নিউটনের মাধ্যমে।

জ্যোতিষ শাস্ত্র (Astrology) ও জ্যোতির্বিজ্ঞান (Astronomy) ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পথে যে সিদ্ধান্ত আসে তা অভিন্ন।

অসীত কুমার চক্রবর্ত্তীর ‘জ্যোতিষ বিজ্ঞান কথা’ গ্রন্থে জানা যায়- বহু বিজ্ঞানী চাঁদের প্রভাব সম্পর্কে জ্যোতিষ শাস্ত্রের বক্তব্য সমর্থন করেন।১৯৭৮ থেকে ১৯৮২ এর মধ্যে কয়েকজন খ্যাতনামা বিজ্ঞানী গবেষণা মাধ্যমে সিদ্ধান্থে আসেন, পূর্ণচন্দ্র শুধুমাত্র মানুষের আবেগ বা চঞ্চলতাই বৃদ্ধি করে না, মানুয়ের অপরাধ প্রবণতাকেও জাগিয়ে দেয়।তাঁদের আরও বক্তব্য যে, এ সময়ে চাঁদের আলো এবং আকর্ষণ মানুষের শারীরিক ও মানসিক শক্তির অবনতি, বিভিন্ন প্রকার রোগ, হত্যা এবং আত্বহত্যা করার মানসিকতার সহায়ক হয়ে উঠে।১৯৬৩ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় ফরেনসিক সায়েন্স – ভেষজ বিজ্ঞান, রোগনিদান তত্ত্ব ও বিষ বিজ্ঞান সম্বন্ধে একটি আন্তর্জাতিক আলোচনা চক্রে পৃথিরীর খ্যাতনামা বিজ্ঞানীরা অংশ গ্রহণ করেন।সেখানে ম্যাসাচুসেটস্‌ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী ডঃ জ্যানিনো একটি গবেষণা পত্র উপস্থাপিত করে বলেন, সাহিত্য এবং প্রাচীন জনশ্রুতিতে চাঁদের প্রভাবে মানুষের সামাজিক মতিভ্রম বা উম্মত্ততা-কুসংস্কার বা উদ্ভট কল্পনা নয়, সত্যই চাঁদ মানুষকে প্রভাবিত করে।ডঃ জ্যানিনো চাঁদের প্রভাব সম্বন্ধে বহু যুক্তিপূর্ণ বক্তব্যের উপসংহারে বলেন, শারীর বৃত্তীয় পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, পূর্ণিমা ও অমাবস্যায় মানুষের দেহের তড়িৎ বিভব বৃদ্ধি পায়।

ল্যাটিন ভাষায় চাঁদকে লুনা বলে।এই লুনাই উন্মাদনা সৃষ্টির কারক বলে উন্মাদ কথার ইংরেজী লুনাটিক শব্দের উৎপত্তি মহাকবি মিল্টন তার ‘প্যারাডাইস লষ্ট’ মহাকাব্যে মানুয়ের মস্তিষ্কের সঙ্গে চাঁদের সংযোগ কথা উল্লেখ করেছেন।

একথা আজ পরিস্কার, চন্দ্রের প্রভাব ব্যক্তি বিশেষ ছাড়াও অঞ্চল বিশেষেও ক্রিয়াশীল।যা হোক চন্দ্রই যে মানুয়ের দেহস’ তরল পদার্থ এবং মনকে পরিচালিত করে তা পরিস্কার বলা আছে জ্যোতিষ শাস্ত্রে।এই শাস্ত্রের মতে কোন মানুষের মন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হওয়ার জন্য চন্দ্রের পূর্ণতা, বলবত্তা এবং শুভ স্থানে অবস্থান আবশ্যক।চন্দ্রের বলবত্তা হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে মানুস বল হ্রাস পাওয়ার সম্পর্ক সমানুপাতিক।

উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, যদি কোন জাতকের জন্ম সময়ে চন্দ্র নীচস্থ স্থানে, ক্ষীণ অবস্থায়, শনি, মঙ্গল, বা রাহুর সঙ্গে অবস্থান করে তা হলে সেই জাতকের মানসিক অসি’রতা, রোগজনিত উৎকণ্ঠা, আবেগ, অহেতুক ভয়, হিষ্টিরিয়া, অবসাদ, আতঙ্ক ইত্যাদির শিকার হয়ে সাইকোনিউরোসিস নামক মানসিক ব্যধিযুক্ত বলে পরিচিত হয়।এমন অবস্থায় জাতকের মানসিক ভারসাম্যও নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশী।আর জন্ম সময়ে বলবান চদ্রের জাতক ব্যক্তি তেজস্বী, দীর্ঘায়ূ ধার্মিক ও সুন্দর চক্ষু বিশিষ্ট হয়।চন্দ্র বৃষ বা কর্কট রাশিতে অবস্থানে জাতক/জাতিকা ধনী, সদাহাস্যময় ও জনপ্রিয় হয়ে থাকে।শুভ চন্দ্রের জাতক জাতিকা সুন্দর স্বাস্থ্য, স্নেহ মমতা, প্রেম, দাম্পত্য জীবনে সুখ, সঙ্গীত, শিল্পকলা, পানির সাথে সম্পৃক্ত ব্যবসা, পুস্তক, প্রকাশনা, লেখা, বুদ্ধিবৃত্তি ও অধ্যাপনা ইত্যাদি বিষয়ে সাফল্য লাভ করেন।

বর্তমানে বৈজ্ঞানিকগণ বলছেন যে চন্দ্রের রাশিচক্রাবর্তনের সংযোগ জলজ জীবজন্তু এবং মৎস্যাদির পর্যন্ত ঋতুর আবর্তন হয়ে থাকে।ঐ সকল জীবজন্তু ও মৎস্যাদির ষড়ঋতুভেদে ডিম্ব উৎপাদনের ঋতুকাল উপস্থিত হয়।এই বিষয়ে বৈজ্ঞানিক ঐ. H. Murnofox কে Science and progress পুস্তকে Lunar Periodicity in Reproduction প্রবন্ধে বিস্তারিত বর্ণনাও করেছেন।যা হোক-

চন্দ্রের আবর্তন সময় প্রায় ২৮ দিন।নারীর ঋতুকাল ২৮ দিনের সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত বলে জ্যোতিষ শাস্ত্রের মত।এ মতবাদের সমর্থনে বিবর্তনবাদের স্রষ্টা ডারউইন বলেছেন- “Man is descended from fish ….. Why should not the 28 day feminine cycle be a vestige of the past when life depended on the tides, and therefore the moon?” দেহস্থ তরল রক্তের উপর চন্দ্রের প্রভাব, নারীর ঋতুকালের আবর্তন, রক্তের গুণাগুণ ইত্যাদি ছাড়াও আমাদের দেহের তরল রসকেও চন্দ্র নিয়ন্ত্রণ করে।মানুয়ের জন্ম সময়ে চন্দ্রের অবস্থান এবং তার শুভাশুভ বিবেচনা করেই শারীরিক ও মানসিক শুভাশুভ নির্ণয় করা হয়।

জ্যোতিষ শাস্ত্রের মতে রক্তের ক্রটিহীনতা এবং সুস্থ্য, সবল মানসিকতার জন্য চন্দ্রের বলবত্তা এবং শুভত্ব অপরিহার্য।গ্রহের প্রতিফলিত রশ্মি পরিমান ও পরিমাপ যোগ্য।গ্রহের রশ্মির পরিমাণ নির্দ্ধারণের প্রতিক্রিয়ও সম্পূর্ণবিজ্ঞান ভিত্তিক।জ্যেতিষ বিজ্ঞান কথা গ্রনে’ আরো জানা যায় যে, চেকোশ্লোভাকিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রকের অধীনে আধুনিক যন্ত্রগণক, গাইনোকোলজিষ্ট, ফিসিসাইষ্ট্রিস প্রভৃতি নিয়ে একটা বিভাগ রয়েছে।এই বিভাগের নাম “এ্যাষ্ট্রো রিসার্চ সেন্টার”।এ্যাষ্ট্রো রিসার্চ সেন্টারের মূখ্য কাজ হল বিভিন্ন জাতকের জন্ম সময়ে সূর্য, চন্দ্র এবং অন্যান্য গ্রহদের অবস্থান নির্ণয় করে জ্যোতিষশাস্ত্র মতে জন্ম নিয়ন্ত্রণের, গর্ভধারণের, এমন কি অস্ত্রোপচারের সঠিক সময় নির্ণয় করে দেওয়া।একই উপায়ে তাঁরা গর্ভধারণে ইচ্ছুক রমণীর গর্ভধারনের সময়, যাদের গর্ভনাশ হয়ে যায় তাদের জন্য সঠিক সময় নির্ণয়, এমনকি তাঁরা পুত্র বা কন্যা যা চাইবেন তারও সময় জ্যোতিষশাস্ত্র মতে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

ঐ এ্যাষ্ট্রোরিসার্চসেন্টারের আর একজন চিকিৎসা বিজ্ঞানী Eugen Jones তাঁর Predetermining of Sex of a child বইয়ে মত প্রকাশ করেছেন যে প্রতিটি নারীর ঋতুকাল চন্দ্রের দ্বারা প্রভাবিত এবং প্রতিটি জাতক জন্মকালীন বিভিন্ন গ্রহের অবস্থানে প্রভাবিত।তিনি আরও জানান জ্যোতিষশাস্ত্র মতে কোন নারী কখন গর্ভবতী হবেন বা হবেন না, তা আগে থেকে জানিয়ে দেওয়া সম্ভব।মূক, বধির পঙ্গু ইত্যাদি সন্তানের জন্মের জন্য গর্ভধারণ সময়ে অশুভ গ্রহের অবস্থানকেই তিনি একমাত্র কারণ বলে মনে করেন।

জ্যোতিষশাস্ত্র মতে জন্ম নিয়ন্ত্রণ, গর্ভধারণ ইত্যাদি প্রক্রিয়া চেকোশ্লোভাকিয়ার মত হাঙ্গেরীতেও প্রচলিত হয়েছে।সেখানে Budapest Obstetric Clinic-এর প্রধান অধিকর্তা জ্যোতিষশাস্ত্র মতে পরিবার পরিকল্পনার উপদেশ দিয়ে সম্পূর্ন ভাবে সফল হয়েছেন।

শুধু চন্দ্রই নয়, জ্যোতিষশাস্ত্র মতে সূর্য, শনি, বুধ, মঙ্গল, বৃহস্পতি, রাহু, কেতু ইউরেনাস, নেপচুন বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন ভাবে মানবজীবন ও জীব জগতকে প্রভাবিত করে।আর গ্রহ নক্ষত্রের বিচার বিশ্লেষণের হিসাবের উপরেই জ্যোতিষশাস্ত্র প্রতিষ্ঠিত।

স্রষ্টা সর্বজ্ঞ; মানুষের ভাগ্য ও কর্ম এ’দুয়ের মধ্যে রয়েছে এক বন্ধন।মানুষের কিছুটা চালিত হয় কর্ম দিয়ে আর কিছু অংশ ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল।মানুষ যদি পার্থিব শক্তির হাতে কেবল একটা পুতুল হতো তা’হলে আধ্যাত্মিক শক্তি বলে কিছু থাকতো না।মানুষের ইচ্ছা শক্তির ওপর কর্তব্য কর্মের ফলাফল নির্ভর করে।
জ্যোতিষ শাস্ত্রের মতে সৃষ্টি কর্তার বিধি নিয়মের শাসন কারক হলো গ্রহেরা।এখানে প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যায় যে, জ্ঞান সমুদ্র ইসলামের সর্বপ্রথম আমীরুল মোমেনীন হজরত আলী (রাঃ) খলিফা হিসাবে সর্বপ্রথম তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি অধিক জোর দিয়েছিলেন।তাঁর অসংখ্য নীতিবাক্য ও দার্শনিক উক্তি বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়েছে।তিনি একজন কবি হিসেবেও খ্যাত ছিলেন।“আনওয়ারুল আকওয়াল” নামক তাঁর একটি দীওয়ান বা কাব্যগ্রনে’র কথাও কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন।তাঁর নামে প্রচলিত অনার একটি কাব্য গ্রন্থ “দীওয়ানে আলী” আজও আরবী মাদ্রাসা সমূহে পাঠ্য পুস্তক হিসাবে বিদ্যমান।আরবী ব্যাকরণসহ আরও বহু সূক্ষ্মজটিল শাস্ত্রের প্রবর্তক হিসাবে হজরত আলী (রাঃ) এর নাম সর্বজন স্বীকৃত।তাঁর আবিস্কৃত বা প্রবর্তিত বহু শাস্ত্র জ্ঞানের এক দীর্ঘ তালিকাও গবেষকগণ পেশ করেছেন।কেরাত, ফরায়েজ, কালাম, খেতাব, কেতাবত, স্বপ্নের তাবীর, নক্ষত্র বিদ্যা, তিব্ব কবিতা ও ছন্দ বিদ্যা, অংক প্রভৃতি শাস্ত্রে তিনি ছিলেন অত্যন্ত পারদর্শী।বিশেষতঃ ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের সর্বক্ষেত্রেই তাঁকে মুসলমানদের ইমাম মানা হয়ে থাকে।

‘নাহাজুল বালাগাহ’ নামক প্রসিদ্ধ গ্রন্থ হজরত আলী (রাঃ) এর রচনা বলে প্রচলিত।ইংরেজীসহ বিভিন্ন ভাষায় এর অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে।এই গ্রন্থে হজরত আলী (রাঃ) জ্যোতিষশাস্ত্র সম্পর্কে বলেন- “হে মোমেন সব তোমরা জ্যোতিষশাস্ত্র ততটুকু শেখো, যতটুকু দ্বারা আত্মরক্ষা করা চলে।”

সুতরাং সৃষ্টিকর্তা বা খোদার উপর খোদকারী নয়-প্রকৃত পক্ষে জ্যোতিষশাস্ত্র দ্বারা অপার মহিমা, জীবন পথের নির্দেশনা, জীবন দর্শনের গতিধারা, আধ্যাত্মিকতার সন্ধান, বাস্তব জীবনের রূপরেখা ও বর্তমান সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়।

এর ভিত্তি হচ্ছে জন্মকালীন গ্রহ নক্ষত্র ও গ্রহদের অবস্থানের সঠিক হিসাব।সুহৃদ পাঠকবৃন্দ গ্রহরে প্রভাব সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা।

জ্যোতিষ বিজ্ঞানে রত্নের ভুমিকাঃ
রত্ন-পাথরের ইতিহাস থেকে জানা যায় ভূত্বকে, ভূগর্ভে ও সমুদ্রগর্ভে সুনীল জলরাশির তলে বিভিন্ন প্রকার রত্ন-পাথর পাওয়া যায়।

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে গ্রহ-নক্ষত্রের শুভাশুভ ক্রিয়া মানুয়ের জীবনে বিদ্যমান থাকলেও রত্ন দ্বারা কি তার প্রতিকার সম্ভব? বা রত্ন ধারণে কি উপকৃত হওয়া যায়?

এর উত্তরে বলবো যে, মানব দেহের প্রতিটি অঙ্গ পরমাণুর সমন্বয়ে সৃষ্ট।সৌরমন্ডলের গ্রহগুলোও পরমাণুর সমষ্টি।আর বিভিন্ন প্রকার রত্নগুলো এমন সব পদার্থের সমন্বয়ে সৃষ্ট যার উপসথিতি মানব দেহেও বিদ্যমান।বিভিন্ন প্রকার রত্ন সরাসরি মানব দেহের ত্বককে স্পর্শ করে শরীরের উপর ইলেকটো ম্যাগনেটিক (Electro Magnetic) প্রভাব বিস্তার করে, মানব দেহের বিদ্যমান যে কোন পদার্থের অসামঞ্জস্যপূর্ণ উপসি’তির সামঞ্জস্য আনয়ন করে।

বিভিন্ন প্রকার রত্ন বিভিন্ন গ্রহের রশ্মি অতিমাত্রায় আকর্ষণ বা বিকর্ষণ করতে পারে।তাই রত্ন ধারণ করে স্নায়ুর উপর বিশেষ বিশেষ গ্রহের রশ্মি যোগ বা বিয়োগ করে শক্তিশালী করা সম্ভব।ফলে স্নায়ুগুলি শক্তিশালী হবে ও নতুন চিন্তা চেতনায় জীবন প্রবাহের ক্ষেত্রে সুশৃঙ্খল ভাবে এগিয়ে নিবে।আলোক রশ্মি, বায়ুমন্ডল (Atmosphere) ভেদ করে পৃথিরীর ভূ’ভাগের উপর পতিত হয়।গ্রহদের যেমন নিজস্ব তেজ বিকিরণের ক্ষমতা আছে, প্রতিটি রত্মেরও তেমনি পৃথক পৃথক তেজ আহরণের ক্ষমতা আছে।সূর্য এবং গ্রহমন্ডল থেকে বেরিয়ে আসা এই আলোক রশ্মিই আমাদের উপর নানাভাবে কাজ করে।ভু’গর্ভে বা সমুদ্র গর্ভে যে সকল রত্ন-পাথর সৃষ্টি হয় তাহাও ঐ সৌর রশ্মিরই রাসায়ণিক ক্রিয়ারফল।মানব দেহের উপর Cosmic Ray জধু এর প্রভাব বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত ।সূর্যের আল্ট্রা ভায়োলেট রশ্মি (Ultra-Violet Ray) ও অপরাপর রঙ বিভিন্ন প্রকার রত্ম-পাথর এবং এর আভ্যন্তরীণ প্রচ্ছন্ন শক্তির উপর পরোক্ষ ও প্রত্যেক্ষভাবে ক্রিয়াশীল হয়ে মানবদেহে সংক্রামিত বিভিন্ন প্রকার ব্যাধির প্রতিকার করতে পারে।উল্লেখ্য রত্ম গুলোতেও বিভিন্ন রঙ বিদ্যমান।রত্নগুলো হচ্ছে-হীরা, রুবী, পান্না, মুক্তা, গোমেদ, ক্যাটসআই, পোখরাজ, প্রবাল ইত্যাদি।

আরো জানা যায়, বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ সৌরজগৎ (Solar System) -কে স্পেকট্রোস্কোপ (Spactroscope) দিয়ে বিশ্লেষণ, পরিশীলন এবং অধুনা আবিষকৃত “কিরলিয়ান ফটো পদ্ধতি” দ্বারা যে ব্যাখ্যা পেয়েছেন, তার সাথে প্রাচীন জ্যোতিষশাস্ত্রবিদগণ (Astrologer) কর্তৃক বিশ্লেষিত জ্যোতিষ শাস্ত্রের বিভিন্ন তত্ত্বীয় ও ফলিত মতবাদ গুলোর মধ্যে সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছেন।জ্যোতির্বিজ্ঞান (Astronomy) আজ প্রমাণ করছে যে, গ্রহ নক্ষত্র ও নক্ষত্র পুঞ্জগুলোর প্রতিটির উজ্জ্বলতা (Lumination) অনুযায়ী পৃথক পৃথক রঙ বিদ্যমান যেমন আমাদের সূর্যের রঙ হচ্ছে হালকা কমলা, শুক্রের রঙ হচ্ছে ধবধবে সাদা আর উত্তর আকাশের অন্যতম উজ্জ্বলতম তারকা প্রক্সিমা সেন্টরাই (Proxima Centauri) এর রং হচ্ছে উজ্জ্বল নীল।
প্রাচীন জ্যোতিষবিগদগণ হাতের বিভিন্ন স্থানে বিবিধ গ্রহের অবস্থান ধরে সে স্থান গুলোকে বিবিধ রং এর প্রতিবিম্ব (Reflection) উল্লেখ করেছেন।আর বিভিন্ন প্রকার রত্ন-পাথরের রঙ যে ভিন্ন ভিন্ন তার সাথে গ্রহ ও নক্ষত্রের রঙ এর সাদৃশ্যও তাঁরা এভাবে পেয়েছেন।সুতরাং জ্যোতিষ বিজ্ঞানে রত্নের ব্যবহার অভ্রান্ত নয় বলেই মনে হয়।

প্রখ্যাত জেমোলজিষ্ট (Gemmologist) জেমোলজিক্যাল ইনষ্টিটিউট অব আমেরিকার সদস্য, জেমোলজিক্যাল এসোসিয়েশন অব গ্রেট বৃটেন-এর ফেলো এবং ইংরেজী নওরতন (Nowratan) পুস-কের লেখক এম, এফ, ইসলাম রত্ন-পাথর প্রসঙ্গে তাঁর গ্রনে’ মানবজীবনে রত্ন-পাথরের প্রভাব ও গুণাগুণ সম্পর্কে বলেন- “An International Currency; a cheerer of soul; a healer of diseases; a charm against enchantment, magic, evil spirits and jealousy; a guide and indicator of the wearer’s health; a protector of hunter against wild beasts, insects, and snakes; to enhance charm and beauty, strength and stability in the fairsex as well as man; to increase concentration in meditation and prayer.”

তবে রত্ন-পাথরের যথাযথ প্রয়োগ কৌশল সম্পর্কে খুব অল্প সংখ্যক মানুষ অবহিত।একথা মনে রাখতে হবে যে, ভুল ঔষধ সেবনের কারণে বা প্রয়োজন ব্যতিত ঔষধ ব্যবহারে যেমন জীবননাশ বা ক্ষতি হতে পারে: তেমনি প্রয়োজন ছাড়া রত্ন ব্যবহার বা যথার্থ রত্নের ভুল ব্যবহারের কারণেও মারাত্বক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনাও প্রচুর।তাই রত্ন-পাথর ব্যবহারে বিশেষজ্ঞ বা অভিজ্ঞ জ্যোতিষের পরামর্শ একান্ত কর্তব্য।ভুললে চলবেনা যে অণুর সমম্বয়েই রত্নের উৎপত্তি আর দ্রব্য গুণ অনস্বীকার্য।

ইসলামের দৃষ্টিতে রত্ন-পাথর ও তার ব্যবহার

মানব জাতির সার্বিক মঙ্গলের জন্য ইসলাম বস্তু জগতের সব রকম কল্যাণ ও অকল্যাণের ব্যাপারে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত প্রদান করেছেন।জ্ঞান রাজ্যের সকল শাখা সম্পর্কে ইসলামের মৌল ও একমাত্র গ্রন্থ আল কুরআন হচ্ছে সুবিসৃত প্রামান্য দলিল।এই আল-কুরআন সমগ্র মানব-জাতির জন্য প্রয়োজনীয় সকল বিষয়ে সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে আলোকপাত করেছে।তবে কিছু জটিল ও অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়ে কুরআন জ্ঞানগর্ভ বিবরণ দিয়েছে যা সাধারণ মানুয়ের নিকট দুর্বোধ্য।এমনি এক বিষয় হচ্ছে রত্ন-পাথর প্রসঙ্গ।ইসলামের আবির্ভাব কালে হজরত আলী (রাঃ) হজরত ওসমান (রাঃ) সহ তদানীন্তন নেতৃস্থানীয় আরব অভিজাত ব্যক্তিবর্গের হাতে মহামূল্যবান রত্ন-পাথর শোভা পেলেও ইসলাম অজ্ঞাতকারণে রত্ন-পাথর সম্পর্কিত বিষয়টি অত্যন্ত প্রচ্ছন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সঃ) এর হাতে আকীক পাথর শোভা পেলেও আমরা মহামূল্যবান রত্ন-পাথরের ব্যবহার সম্পর্কে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাই না।তবে এর অর্থ এই নয় যে, ইসলাম রত্ন-পাথর ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে।ইসলাম বস’র দ্রব্যগুণ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব (Scientific theory) উপস্থাপন করেছে।তাই সৃষ্টির এক অপরূপ প্রকাশ রত্ন-পাথরের দ্রব্যগুন সম্পর্কেও ইসলাম আমাদেরকে অবহিত করেছে।শুধু এর উপরই অতিরিক্ত গুরুত্বারোপ অর্থাৎ শেরেকি ভাবধারা আরোপের ব্যাপারে ইসলাম সকলকে হুশিয়ার করে দিয়েছে।এ কথার অর্থ এই দাঁড়ায় যে, রত্ন-পাথরের ‘রত্নগুণ’ হচ্ছে এক জিনিস আর এর উপর শেরেকি ভাবধারা আরোপ হচ্ছে অন্য জিনিস।এ প্রসঙ্গে একটি বিষয়ের উল্লেখ প্রণিধানযোগ্য, হজরত মুহাম্মদ (সঃ) – এর আবির্ভাবের সাথে সাথে তদানীন্তন বিপর্যস্ত আরবজাতির ভাব জগতে সৃষ্টিকর্তা এবং সৃষ্টি রহস্য সম্পর্কে যে ভাবধারার সৃষ্টি হয় সে প্রেক্ষিতে রত্ন-পাথরের গুণাগুণ সম্পর্কিত বিষয়টি খুব বেশি প্রাধান্য পায়নি।পরবর্তীকালে ইসলামের পূণর্জাগরণ কালে (Islamic Renaissance) রত্ন-পাথর সম্পর্কিত বিষয়টি চিন্তাবিদগণের নিকট গবেষণার খোরাক হয়ে দাঁড়ায়।যখন ইসলামের উদার, উজ্জ্বল দীপ্তিতে জ্ঞানের জগতে ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়েছে।তাই এ সময় চিন্তাবিদগণ ধর্ম ও দর্শন চিন্তার পাশাপশি রত্ন-পাথর সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে ভাবতে শুরু করেন।এ সম্পর্কিত বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক ও শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা এ লেখার প্রারম্ভে উল্লেখ করা হয়েছে।

রত্ন-পাথরের ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে উল্লেখ পরোক্ষভাবে আমাদের নিকট এর মাহাত্মা মূর্ত করে তোলে।তাই একটি কুরানিক ব্যাখ্যার উল্লেখ একান- প্রয়োজন।সূরা আর রহমান এর ১৯ ও ২২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-“তিনি প্রবাহিত করেন দুই দরিয়া (সমুদ্র) যারা পরস্পর মিলিত হয় ——উভয় দরিয়া (সমুদ্র) হতে উৎপন্ন হয় মুক্তা ও প্রবাল।তোমরা আমার কোন দানকে অস্বীকার করবে” এরপর কুরআনের অন্যত্র বর্ণিত রয়েছে যে, পৃথিবীতে আল্লাহ্‌তালা যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তা যে কোন ভাবেই হোক মানুয়ের কল্যাণে আসে।মহান আল্লাহ প্রদত্ত রত্ন-পাথর যেমন-জমরুদ, ইয়াকুত, মুক্তা, হীরা, প্রবাল, পোখরাজ ইত্যাদি আল্লাহ্‌র দান এগুলোকে কি আমরা প্রত্যাখ্যান করতে পারি? ইসলামে রত্ন-পাথরের ব্যবহার কতটুকু গ্রহণীয় তার প্রমাণ পাই নবী, রসুল এবং বিশিষ্ট সংস্কারক ও পন্ডিত ব্যক্তিবর্গের রত্ন-পাথর ব্যবহারের দ্বারা।যেমন- হজরত আলী (রাঃ) অন্যান্য রত্নের সাথে ইয়াকুত (Ruby) ব্যবহার করতেন।হজরত আলী (রাঃ) এর মতে যে ইয়াকুত ছিল তার উপর বিশেষ আয়াত লেখা ছিল।‘মাকারিমূল আখলাক’ এর মধ্যে উল্লেখ আছে যে, হজরত ইমাম মূসা কাজিম (আঃ) এর হাতে যে ফিরোজা (Turquise) রত্ন ছিল তার উপর “আল্লাহ-মালিক” লেখা ছিল।আরও জানা যায় হজরত আলী (রাঃ) এবং হজরত ওমর (রাঃ) যখন যুদ্ধে যেতেন তখন এই ফিরোজা রত্ন হাতের বাজুতে অথবা গলায় পরিধান করতেন।কারণ ইহা বিভিন্ন দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা করতে সক্ষম বলে কথিত আছে।
রত্ন-পাথর শুধু যমীন বা পৃথিবীর ভূভাগেই নয়, আকাশমন্ডলী এবং বেহেশ্‌তেও রয়েছে।

হযরত কা’ব আহ্‌বার (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহতা’আলা বেহেশতে ইয়াকুত রত্নের মহল তৈরী করেছেন, প্রত্যেক মহলে সত্তর হাজার কামরা।ইমাম গায্‌যালী (রহঃ) এর মুকাশাফাতুল কুলূব গ্রন্থে জানা যায়, কথিত আছে- ষষ্ঠ আসমান জওহর তথা মহামূল্য পাথর দ্বারা গঠিত।সপ্তম আকাশ হচ্ছে মহামূল্য ইয়াকুত ও লাল বর্ণের প্রবাল পাথর দিয়ে তৈরী।আর এ আসমানেই রয়েছে বাইতুল মা’মুর যার কোন চতুষ্টয়ের একটি লাল ইয়াকুত রত্নের, দ্বিতীয়টি সবুজ পান্না রত্নের।আরো বর্ণিত আছে- বাইতুল-মা’মুর মহামূল্য আকীক পাথরের তৈরী।প্রতিদিন সত্তর হাজার ফেরেশতা এর তওয়াফ করে।

এতক্ষণ ইসলামের দৃষ্টিতে রত্ন-পাথর ও তার ব্যবহার সম্পর্কে যে বিশ্লেষণ পেশ করা হয়েছে তার দৃঢ় তত্ত্ব উন্মোচনের বিষয়টি ততো সহজ নয়।কারণ এ বিষয়টি অনুধাবন করার জন্য অনুভূতির তীব্রতা আর নিরলস সাধনা প্রয়োগ প্রয়োজন।ভাসা ভাসা উপলব্ধি এবং মামুলি কিছুটা চর্চা করেই এর মৌল তত্ত্ব উদঘাটন সম্ভব নয়।কারণ আমরা জানি সাগর গর্ভে যে বিপুল রহস্যরাজি লুকিয়ে রয়েছে তা অনুধাবনে আগ্রহী ব্যক্তি যদি হিমালয় শীর্ষে বসে গবেষণা কর্ম শুরু করেন তবে তার পক্ষে এ গবেষণার ফল লাভ আশা করা যেমন হাস্যকর, তেমনি রত্ন-পাথর সম্পর্কে তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক জ্ঞান অর্জন না করেই এ সম্বন্ধে বিচার বিশ্লেষণ অসম্ভব।তাই আসুন আমরা উদ্বেগহীন শান্তিপূর্ণ জীবন যাপনের জন্য ইসলাম প্রদর্শিত নির্দেশনা অনুযায়ী রত্ন-পাথর ব্যবহারে প্রবৃত্ত হই।প্রকৃত পক্ষে রত্ন-পাথরের গুণাগুণ অনস্বীকার্য।যুগ যুগ ধরে মানবজাতি এর ফলাফল পেয়েছে অনন্ত কাল পাবে।

অতঃপর ‘দ্রব্যগুণ অনস্বীকার্য’ এ ব্যাপারে পন্ডিত শিক্ষিত সমপ্রদায়ের মধ্যে কোন দ্বি-মতের অবকাশ নেই।সুতরাং কোরআন, পুরাণ, বিজ্ঞান, আয়ুর্বেদ, হেকিমী ও জ্যোতিষ বিজ্ঞানের আলোকে বিচার বিশ্লেষণে এবং নিজ অভিজ্ঞতায় বলা যায়- রত্ন ভস্ম অমূল্য ঔষধ; রত্ন মানব মনে আনন্দ দানকারী, শরীর স্বাস্থ্য, সৌন্দর্য, বীর্য ও যৌবন বৃদ্ধির সহায়ক।

শত্রু, হিংস্র জন’র আক্রমণ, দৈব-দুর্বিপাক, রোগশোকে রক্ষাকারী ও অর্থ সম্পদের সহায়ক এবং স্রষ্টার সৃষ্টি রহস্য অনুভব করার এক অনুপম মাধ্যম।ধর্মীয় ও পৌরাণিক দৃষ্টিতে রত্নের ব্যবহার

খৃষ্টান ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ বাইবেল-হীরা, আকীক, পোখরাজ, নীলা, জ্যামোনিয়া প্রভৃতি রত্ন-পাথরের বর্ণনা আছে।বিশেষ করে ওল্ড টেষ্টামেন্টে ‘জেনেসিস’ গ্রনে’র আলোচনায় ‘ব্রিমষ্টোন’ নামক পাথরের কথাও জানা যায়।

অথর্ববেদের বর্ণনা থেকে জানা যায় অশুভ বা বিরুদ্ধ গ্রহের প্রতিকারের উপায় মাত্র দুটি।প্রথম হলো ঈশ্বর আরাধনা-দ্বিতীয় হলো মহামূল্য গ্রহ রত্ন ধারণ।(অর্থাৎ রত্ন-পাথর গ্রহদের প্রভাবিত করে মানুষের কল্যাণ আনয়ন করে ও দৈবদুর্বিপাক থেকে রক্ষা করে)।

মনুসংহিতায় বলা হয়েছে- সুসজ্জিত পোষাকে পবিত্র ভাবে রত্ন-পাথর যথাযথভাবে ধারন করলে জীবজন্তু অনিষ্ট থেকে ও তীব্র কামের উগ্রতা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।এমন কি সবার শ্রদ্ধা লাভ করা যায়।ধন, সম্পত্তি, সুখ-শান্তি বৃদ্ধি পায় এবং রমনীকুল বশীভূত হয়।রত্নচূর্ন ভক্ষণে শরীর চেহারায় শ্রীবৃদ্ধি ঘটে, বিষ ক্রিয়া নষ্ট হয়।

অগ্নি পুরাণ মতে- প্রত্যেকের রত্ন ধারণ করা কর্তব্য বলে উপদেশ দেওয়া হয়েছে।শী্রকৃষ্ণের ‘স্ব্যমন্তকমণি’ ও নারায়ণের ‘কৌন্তভ মনির’ কথা হিন্দু ধর্মবম্বী মধ্যে সর্বজন বিদিত।

কুবের, রাবণ,দুর্যোধন, কংস আরো অন্যান্য রাজন্যবর্গের পভাব প্রতিপত্তির মূলে রত্ন ধারণের ইতিহাস পাওয়া যায়।মহাশক্তি চন্ডী নানা প্রকার রত্ন মন্ডিত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে অসুর নিধন করতেন।

প্রাচীন ধর্ম গ্রন্থগুলোতে বিশেষ করে বেদ, পুরাণ, রামায়ণ ও মহাভারত প্রভৃতিতে রত্ন-পাথার ধারণ বা ব্যবহার করার কথা উল্লেখ রয়েছে।

আর্য সমাজের সৈনিকরা যুদ্ধে যাওয়ার পূর্বক্ষণেই বিভিন্ন প্রকার রত্ন-পাথর ধারণ করে অস্ত্র হাতে যুদ্ধে যেতেন বলেও জানা যায়।

মহাভারতে জানা যায় অশ্বমেধ যজ্ঞের পূর্বে অশ্বরক্ষক অর্জুন তাঁর অচেনা পুত্র বভ্রু বাহনের দ্বারা যুদ্ধে নিহত হলে পত্নী নাগকন্যা উলুপী পিতৃ প্রদত্ত রত্ন দ্বারা স্বামীর জীবন রক্ষা করেন।

আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে রোগ-ব্যাধির নিরাময় বিভিন্ন রোগের জন্য বিভিন্ন রত্নভস্ম ব্যবহার বা ভক্ষনের কথা বলা হয়েছে।আয়ুর্বেদশাস্ত্র মতে রত্ন ভস্ম দ্বারা যে রোগ-ব্যাধি নিরাময় হয় তা ’ আযুর্বেদ চিকিৎসা শাস্ত্রের সাফল্যই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।প্রাচীন কালের এই আয়ুর্বেদ শাস্ত্র আজ বিজ্ঞানের মাপকাঠিতে স্বীকৃত।

আয়ুর্বেদাচার্য্য, সুশ্রুতাচার্য্য, চরক রত্ন-পাথরের ও রত্ন ভস্মের সম্পর্কে এদের গুণাগুণ ও বিভিন্ন প্রকার রোগ-ব্যাধি কিভাবে নিরাময় করে তার বর্ণনা করেছে।মহাভারত ও পুরাণের যুগ হতেই রত্ন-ধারণের ও রত্ন ভস্ম ভক্ষনের প্রথা চলে আসছে। ভেষজ বিজ্ঞানে ও চরক ও সুশ্রুতের দ্বারা ইহার ক্রম ধারা আজও চলছে।